একটি বড় ভূমিকম্প যদি ঢাকাকে আঘাত করে, তাহলে কী হতে পারে?
প্রশ্নটি শুনতে ভয়ংকর। কিন্তু বাস্তবতা হলো—ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে আগে থেকেই প্রস্তুত হওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ভূমিকম্পের ঝুঁকিমুক্ত কোনো দেশ নয়। দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, বিভিন্ন সক্রিয় ভূ-গাঠনিক অঞ্চল, দ্রুত নগরায়ণ এবং ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলো—সব মিলিয়ে বড় ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হয়। জাতিসংঘের বাংলাদেশ কার্যালয়ের একটি জাতীয় ভূমিকম্প ঝুঁকি মূল্যায়নেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভূমিকম্প ঝুঁকি, জনসংখ্যা, ভবন ও অবকাঠামোর দুর্বলতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আর এই আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ঢাকা।
ঢাকার জন্য ঝুঁকিটা এত বেশি কেন?
ঢাকা বাংলাদেশের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ নগরকেন্দ্রগুলোর একটি। এখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ তুলনামূলক ছোট এলাকায় বসবাস ও কাজ করে। ফলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে সমস্যা শুধু ভবন ধসে পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
একসঙ্গে প্রভাব পড়তে পারে—
- আবাসিক ভবন
- অফিস ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান
- হাসপাতাল
- স্কুল-কলেজ
- সড়ক ও সেতু
- বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ
- পানি ও যোগাযোগব্যবস্থা
- ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধার কার্যক্রম
- মোবাইল ও ইন্টারনেট যোগাযোগ
বিশ্বব্যাংকের নগর দুর্যোগ ঝুঁকি বিশ্লেষণেও ঢাকার ক্ষেত্রে দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্মাণমান এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর দুর্বলতাকে ভূমিকম্পজনিত ঝুঁকির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বড় ভূমিকম্প হলে ঢাকার প্রথম কয়েক ঘণ্টায় কী হতে পারে?
ধরা যাক, ঢাকায় একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হলো।
প্রথম কয়েক মিনিটেই শহরের স্বাভাবিক জীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
১. ভবনে ফাটল ও আংশিক বা সম্পূর্ণ ধস
ভূমিকম্পে সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গা হলো ভবন।
সব ভবন একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। ভবনের নকশা, নির্মাণমান, বয়স, মাটির বৈশিষ্ট্য এবং ভূমিকম্পের তীব্রতার ওপর ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই নির্ভর করবে।
যেসব ভবন প্রকৌশলগতভাবে দুর্বল বা যথাযথ নির্মাণবিধি অনুসরণ করে তৈরি হয়নি, সেগুলো বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারে।
বাংলাদেশে বর্তমানে Bangladesh National Building Code (BNBC) 2020 কার্যকর রয়েছে। তবে শুধু কোড থাকা যথেষ্ট নয়—নির্মাণের সময় সেটি যথাযথভাবে অনুসরণ ও প্রয়োগ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
২. রাস্তায় তৈরি হতে পারে ভয়াবহ যানজট
ভূমিকম্পের পর মানুষ স্বাভাবিকভাবেই পরিবার ও স্বজনদের খোঁজে বের হতে চাইবে।
একই সময়ে—
- অফিস থেকে মানুষ বের হবে
- স্কুল থেকে অভিভাবকরা সন্তান নিতে ছুটবেন
- হাসপাতালের সামনে ভিড় হবে
- মানুষ নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করবে
- উদ্ধারকারী দল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যেতে চাইবে
ফলে ঢাকার স্বাভাবিক যান চলাচল দ্রুত অচল হয়ে যেতে পারে।
এখানে একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ:
ভূমিকম্পের পর শুধু ভবন ধস নয়, উদ্ধারকারী গাড়ির ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারাও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
৩. বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সমস্যা হতে পারে
বড় ভূমিকম্পে শুধু ভবন নয়, শহরের গুরুত্বপূর্ণ ইউটিলিটি নেটওয়ার্কও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কোথাও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হতে পারে, কোথাও পানির লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, আবার গ্যাসলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ ভূমিকম্প শেষ হওয়ার পরও secondary disaster বা পরবর্তী ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ-সংক্রান্ত ভূমিকম্প প্রতিবেদনে ভূমিকম্পের পর কাঠামোগত ক্ষতির পাশাপাশি পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ আশ্রয়ের মতো বিষয়গুলোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৪. হাসপাতালের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হতে পারে
একটি বড় ভূমিকম্পে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ আহত হলে হাসপাতালগুলোর ওপর অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হতে পারে।
শুধু আহত মানুষ নয়—যেসব হাসপাতাল নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাদের কার্যক্রমও ব্যাহত হতে পারে।
এই কারণেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় শুধু হাসপাতাল তৈরি করাই নয়, জরুরি অবস্থায় হাসপাতাল কতটা কার্যকর থাকতে পারবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকি মূল্যায়নে হাসপাতাল, জরুরি সেবা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে ঝুঁকি কমানোর পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
৫. আতঙ্ক পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে
ভূমিকম্পের সময় মানুষ ভয় পাবে—এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু ভুল সিদ্ধান্ত বিপদ বাড়াতে পারে।
যেমন—
- লিফটে ওঠার চেষ্টা করা
- জানালার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা
- ধাক্কাধাক্কি করে সিঁড়িতে নামা
- ভূমিকম্প চলার সময় ভবন থেকে লাফ দেওয়া
- গুজবের ভিত্তিতে কোথাও ছুটে যাওয়া
এসব আচরণ পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করতে পারে।
তাই ভূমিকম্প মোকাবিলায় মানুষের প্রস্তুতি ও সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে কি পুরো ঢাকা ধ্বংস হয়ে যাবে?
এমন কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
একটি বড় ভূমিকম্প হলেও ঢাকার প্রতিটি ভবন একই মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে ভূমিকম্পের—
- মাত্রা
- উৎপত্তিস্থল
- গভীরতা
- ঢাকার অবস্থান থেকে দূরত্ব
- মাটির ধরন
- ভবনের নকশা
- নির্মাণমান
- ভবনগুলোর বয়স
- উদ্ধার ও জরুরি সেবার সক্ষমতা
ইত্যাদির ওপর।
বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকি মূল্যায়নেও বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভবন, জনসংখ্যা, অবকাঠামো এবং সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
তাই “ভূমিকম্প হলেই ঢাকা শেষ”—এ ধরনের বক্তব্য যেমন অতিরঞ্জিত, তেমনি “ঢাকার কোনো বড় ঝুঁকি নেই”—এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো আমাদের কী শেখায়?
ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা শুধু তাত্ত্বিক বিষয় নয়।
২১ নভেম্বর ২০২৫ সালে বাংলাদেশে একটি ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যা ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় শক্তভাবে অনুভূত হয়েছিল। এরপর ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ আরেকটি ৫.৪ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরার আশাশুনি এলাকায়।
এই ঘটনাগুলো বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস নয়। কোনো নির্দিষ্ট ভূমিকম্প কখন হবে, তা এভাবে বলা যায় না।
তবে এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ভূমিকম্প বাংলাদেশের জন্য বাস্তব একটি দুর্যোগ ঝুঁকি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: আমরা কী করতে পারি?
ভূমিকম্প ঠেকানো সম্ভব নয়। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কমানোর অনেক সুযোগ আছে।
পরিবারের জন্য
প্রতিটি পরিবার আগে থেকেই ঠিক করে রাখতে পারে—
ভূমিকম্প হলে কোথায় আশ্রয় নেব?
পরিবারের সদস্যরা আলাদা জায়গায় থাকলে কীভাবে যোগাযোগ করব?
জরুরি ব্যাগ কোথায় থাকবে?
বাসার গ্যাস ও বিদ্যুতের প্রধান সংযোগ কোথায়?
এগুলো আগে থেকে জানা থাকলে জরুরি মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
ভবন কেনার আগে বা ভাড়া নেওয়ার আগে কী ভাববেন?
ঢাকায় বাসা নেওয়ার সময় শুধু—
“ফ্ল্যাটটা কত সুন্দর?”
বা
“লোকেশন কত ভালো?”
এগুলো দেখলেই হবে না।
ভবনটি কীভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, অনুমোদন ও প্রকৌশলগত বিষয়গুলো ঠিক আছে কি না, ভবনের বয়স এবং নিরাপত্তা সম্পর্কিত তথ্য—এসব বিষয়ও বিবেচনা করা উচিত।
কারণ ভূমিকম্পের সময় একটি ভবনের সৌন্দর্য নয়, তার কাঠামোগত নিরাপত্তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
ঢাকার ভূমিকম্প ঝুঁকি কমাতে শুধু নতুন ভবন নিরাপদভাবে তৈরি করলেই হবে না।
পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো শক্তিশালী করা, উদ্ধার সক্ষমতা বাড়ানো, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোও প্রয়োজন।
বাংলাদেশের Urban Resilience উদ্যোগগুলোর লক্ষ্যগুলোর মধ্যে জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিদ্যমান অবকাঠামোর স্থিতিস্থাপকতা এবং নিরাপদ নির্মাণ নিশ্চিত করার বিষয়গুলো রয়েছে।
শেষ কথা
ঢাকায় বড় ভূমিকম্প হলে কী হবে—এর সম্পূর্ণ চিত্র আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত:
ভূমিকম্পের ক্ষতি শুধু ভূমিকম্পের শক্তির ওপর নির্ভর করে না; একটি শহর কতটা প্রস্তুত, তার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে।
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে প্রস্তুতির অর্থ শুধু সরকারের প্রস্তুতি নয়। এটি আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্বও।
নিজের বাসার নিরাপত্তা সম্পর্কে জানা, পরিবারের জন্য জরুরি পরিকল্পনা করা, ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং গুজবের পরিবর্তে নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুসরণ করা—এসব ছোট পদক্ষেপ ভবিষ্যতের বড় বিপদের সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ভূমিকম্প কখন হবে, আমরা জানি না। কিন্তু ভূমিকম্প হলে আমরা কতটা প্রস্তুত থাকব—সেটি অনেকটাই আমাদের হাতে।